সোমবার, ২৫ জানুয়ারী ২০২১, ০৩:৩৩ পূর্বাহ্ন১১ই মাঘ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

১১ই জমাদিউস সানি, ১৪৪২ হিজরি

লাগামহীন পেঁয়াজের দাম: কারসাজি বন্ধ করা যাচ্ছে না কেন?

লাগামহীন পেঁয়াজের দাম: কারসাজি বন্ধ করা যাচ্ছে না কেন?

মূল্যবৃদ্ধির ক্ষেত্রে পেঁয়াজ অতীতের সব রেকর্ড ভঙ্গ করেছে। বৃহস্পতিবার রাজধানীর বিভিন্ন বাজারে প্রতিকেজি পেঁয়াজ ২২০ টাকা দরে বিক্রি হলেও গতকাল শুক্রবার তা আড়াইশ’ টাকার ঘরে পৌঁছে।

হতাশাজনক হল, গত দেড় মাসেরও বেশি সময় ধরে এ নিত্যপণ্যটির দাম বাড়তে বাড়তে বর্তমান অবস্থায় উপনীত হলেও সরকার এক্ষেত্রে কার্যত ব্যর্থ হয়েছে; তারা পেঁয়াজের মূল্যবৃদ্ধির আগ্রাসী প্রবণতা রোধ করতে পারেনি। বছরে আমাদের পেঁয়াজের চাহিদা কমপক্ষে ২৪ লাখ টন।

এর মধ্যে দেশে উৎপাদন হয় ১৫ থেকে ১৬ লাখ টন। বাকি ৮ থেকে ৯ লাখ টন আমদানি করতে হয়। গত অর্থবছরে অন্যূন ১২ লাখ টন পেঁয়াজ আমদানি হয়েছে। এ হিসাবে দেশে পেঁয়াজের কোনো ঘাটতি নেই। তারপরও দফায় দফায় কেন পেঁয়াজের দাম বাড়ছে, এ প্রশ্নের উত্তর খোঁজা জরুরি।

মূলত ‘পেঁয়াজ-কাহিনী’র শুরু ১৩ সেপ্টেম্বর; এদিন প্রতিবেশী ভারত পেঁয়াজের রফতানিমূল্য প্রতিটনে ৪০০ ডলার থেকে বাড়িয়ে ৮৫০ ডলার করার পরপরই দেশের বাজারে পেঁয়াজের দাম লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়তে থাকে।

এর কিছুদিন পর আগুনে ঘি ঢালার মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়, যখন ভারত পেঁয়াজ রফতানি পুরোপুরি বন্ধ করে দেয়। এ প্রেক্ষাপটে বিভিন্ন দেশ থেকে পেঁয়াজ আমদানির উদ্যোগ নেয়া হলে সাময়িকভাবে দাম কিছুটা কমে বটে, তবে কয়েকদিনের ব্যবধানে পেঁয়াজ পুনরায় স্বমূর্তি ধারণ করে।

বিশ্লেষকরা এজন্য দায়ী করছেন বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে। তাদের মতে, মন্ত্রণালয়ের অদূরদর্শিতা, পরিকল্পনা ও তদারকির অভাবেই বাজারে পেঁয়াজের দাম নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে। ফলে ভোক্তারা দীর্ঘদিন ধরে কয়েকগুণ বেশি দামে বাজার থেকে পেঁয়াজ কিনতে বাধ্য হচ্ছেন।

দেশের ব্যবসায়ীরা ভারত সরকারের সিদ্ধান্তকে পুঁজি করে পেঁয়াজের দাম যেভাবে বাড়িয়ে চলেছেন, তা অগ্রহণযোগ্য। অতীতেও দেখা গেছে, রমজান অথবা অন্য কোনো অজুহাত সামনে এনে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম কয়েকগুণ বাড়িয়ে দেয়া হয়েছে। পেঁয়াজের ক্ষেত্রেও এমনটাই ঘটেছে, তা বলাই বাহুল্য।

যোগসাজশের মাধ্যমে বাজার ব্যবস্থার স্বাভাবিক গতি যদি বাধাগ্রস্ত করা হয়, তাহলে একদিকে যেমন ভোক্তাস্বার্থের হানি ঘটে, অন্যদিকে দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেও বিরূপ প্রভাব পড়ে। ব্যবসায়ে মুনাফা অর্জন স্বতঃসিদ্ধ ও স্বাভাবিক একটি প্রক্রিয়া।

তবে মুনাফা অর্জনের নামে নীতিজ্ঞানহীন কর্মকাণ্ড সমর্থনযোগ্য নয়। ব্যবসায়ীরা সাধারণ মানুষের দুর্দশা লাঘবে আন্তরিক হলে বছরের অধিকাংশ সময় দ্রব্যমূল্যের বাজার স্থিতিশীল থাকবে বলে আমাদের বিশ্বাস।

পেঁয়াজসহ অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বৃদ্ধির ঘটনায় সাধারণ মানুষের উদ্বিগ্ন হওয়াটাই স্বাভাবিক। বাজারে জিনিসপত্রের দাম বৃদ্ধির সঙ্গে তাল মিলিয়ে ক্রয়ক্ষমতা না বাড়ায় দেশের সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে নিম্নআয়ের শ্রমজীবীরা অসহায়বোধ করেন। অথচ দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির ক্ষেত্রে সরকারের পক্ষ থেকে তেমন উচ্চবাচ্য হয় না বললেই চলে।

বাজার নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে সরকারের শক্ত কোনো ভূমিকা নেই- এ অভিযোগ দীর্ঘদিনের। সাধারণত দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতি নিয়ে কথাবার্তা উঠলে পাইকারি ব্যবসায়ী ও খুচরা ব্যবসায়ীরা পরস্পরকে দোষারোপ করে থাকেন।

এভাবে একপক্ষ অপরপক্ষকে দোষারোপ করলেও এটি মূলত ব্যবসায়ীদের একচেটিয়াভাবে বাজার নিয়ন্ত্রণের প্রয়াস, এতে কোনো সন্দেহ নেই। নানা অপকৌশলে ভোক্তাদের ঠকানো ছাড়াও কারসাজি ও যোগসাজশের মাধ্যমে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়িয়ে দেয়া অনৈতিক তো বটেই; একইসঙ্গে অপরাধও।

প্রতারণা ও লোকঠকানো মানসিকতা পরিহার করে পেঁয়াজসহ অন্যান্য নিত্যপণ্য ও সেবার দাম স্থিতিশীল রাখতে ব্যবসায়ী সমাজ আন্তরিকতার পরিচয় দেবেন, এটাই প্রত্যাশা।

শেয়ার করুন
  • 9
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  





themesba-zoom1715152249
© Daily Jago কর্তৃক সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত।
Developed By: Nagorik IT