মঙ্গলবার, ২৬ জানুয়ারী ২০২১, ০১:৩৯ পূর্বাহ্ন১২ই মাঘ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

১২ই জমাদিউস সানি, ১৪৪২ হিজরি

রূপগঞ্জের ইউএনওঃ মমতাময়ী মমতাজ

রূপগঞ্জের ইউএনওঃ মমতাময়ী মমতাজ

রাসেল আহমেদঃ মমতাজ নামের অর্থ সর্বোৎকৃষ্ট। নামের অর্থের সঙ্গে হুবহু মিল রয়েছে মমতাজ বেগমের। যেমন কাজে, তেমনি গুণে। বলছি রূপগঞ্জের ইউএনও মমতাজ বেগমের কথা। অপরাধীদের কাছে তার পরিচিতি রয়েছে যম হিসাবে। আর সাধারণ লোকজনের কাছে তার পরিচয় রয়েছে মহীয়সী নারী হিসাবে। গত এক বছরে তিনি যেসব কাজ রয়েছেন তা ছিলো জুড়িমেলা ভার। ইতিমধ্যে তিনি রূপগঞ্জের সর্বত্র জনপ্রিয়তা পেয়েছেন। বিশেষ করে রূপগঞ্জের নারীদের কাছে তিনি ‘মমতামীয়’ হিসাবে খ্যাতি কুড়িয়েছেন। তবে অপরাধী, চাঁদাবাজ, সন্ত্রাসী , দখলবাজদের বিরাগভাজন হয়েছেন।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, শরীয়তপুরের ভেদরগঞ্জ এলাকার মুক্তিযোদ্ধা মোতালেব মিয়ার মেয়ে রূপগঞ্জ উপজেলার নির্বাহী অফিসার মমতাজ বেগম মম। তার মা আলেয়া বেগম একজন গৃহীনি। স্বামী শেখ মোহাম্মদ সাইফউদ্দিন সারোয়ার বেসিক ব্যাংকের এসিস্ট্যান্ট ম্যানেজার। মমতাজ বেগম ২৯ তম বিসিএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। তিনি ২০১১ সালে ঢাকা ডিসি অফিসে এসি হিসাবে যোগ দেন। এরপর ২০১৫ সালে মতিঝিলে এসি হিসাবে কর্মরত ছিলেন। তারপর ২০১৬ সালে ক্যান্টনমেন্টে এসি ছিলেন। ফের ঢাকা ২০১৭ সালে ডিসি অফিসে কর্মরত ছিলেন। এরপর ২০১৯ সালের ফ্রেব্রয়ারী মাসে রূপগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসার হিসাবে যোগদান করেন। তার এক কন্যা আফরাহ ইসলাম ও এক পুত্র শেখ আবরার আযওয়াদ আরাশ।

রূপগঞ্জের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে সাধারণ মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, রূপগঞ্জের মানবিক ইউএনও হিসাবে মমতাজ বেগম গোটা রূপগঞ্জে সমাদৃত হয়েছেন। বিভিন্ন শ্রেণী পেশার মানুষের কাছে তিনি এখন এক উজ্জল নক্ষত্র। রূপগঞ্জ উপজেলায় যোগদানের পর থেকে তিনি সাধারণ মানুষের পক্ষে কাজ করেছেনে। লড়েছেন অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে। এ কারণে অনেকের চক্ষুসূল হয়েছেন। রূপগঞ্জকে সোনার রূপগঞ্জে গড়তে তিনি নিরলস পরিশ্রম করে চলছেন। করোনাকালের মহামারীতেও তিনি নিজের জীবনের ঝূঁকি নিয়ে মাঠে রয়েছেন। পাশে থেকেছেন কর্মহীন, অসহায়-হতদরিদ্র মানুষের।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রূপগঞ্জ উপজেলার নির্বাহী অফিসার মমতাজ বেগম গত বছরের ১২ ফেব্রুয়ারী রূপগঞ্জে যোগদান করেন। যোগদানের পর থেকে রূপগঞ্জ ও রূপগঞ্জের মানুষের প্রতি তার ভালবাসার হাত বাড়িয়ে দেন। ক্রমেই রূপগঞ্জের মানুষের কাছে জনপ্রিয় হয়ে উঠেন। উপজেলা প্রশাসন থেকে প্রায় অর্ধশতাধিক ভ্রাম্যমান আদালত পরিচালনা করা হয়েছে। এছাড়া বাল্য বিয়ে বন্ধ, খাদ্য ও প্রসাধনীতে ভেজাল বিরোধি অভিযান, শিল্প কারখানায় ইটিপি স্থাপন , পরিবেশ দুষণরোধে ভ্রাম্যমান আদালত পরিচালনা, মাদক ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোরতা, নারী ও শিশু নির্যাতন দমনে সরাসরি হস্তক্ষেপ, সাধারণ সুবিধা বঞ্চিতদের পাশে দাড়িয়ে সেবা প্রদান, শিক্ষার মাননোন্নয়নের বিদ্যালয় ভিত্তিক পরিদর্শন ও যথা ব্যবস্থা গ্রহণ, রাস্তা ঘাটের অনিয়ম হলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা, সরকারী বরাদ্দ নিয়ে দূর্নীতির চেষ্টাকারীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নিয়েছেন। বাল্যবিয়ে, যৌতুক প্রথা, অবৈধ উচ্ছেদ, সরকারী জমি উদ্ধার, মাদক নিমূর্ল অভিযান চালিয়ে সাড়া ফেলেছেন।

উপজেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, উপজেলা পরিষদের সামনে বঙ্গবন্ধুর ম্যুরাল তৈরি করেন। যেটা উপজেলা পর্যায়ে রূপগঞ্জেই প্রথম। রূপগঞ্জ সদর ইউনিয়নে প্রতিবন্ধীদের জন্য গড়ে তুলেছেন সুবর্ণ নাগরিক সেবা কেন্দ্র। যে সব প্রতিবন্ধী শিশুরা এখনো তালিকায় আসেনি তাদের চিকিৎসা সেবা, খাবার দেওয়াসহ নানাবিধ সুযোগ-সুবিধা প্রদান করা হয়। প্রায় সাড়ে ৩শ’ প্রতিবন্ধী এ সেবার আওতায় নিয়ে আসেন। বঙ্গবন্ধুর ইতিহাস নিয়ে যেনো কেউ বিকৃত করতে না পারে তার জন্য বঙ্গবন্ধুর ১২শ’ দুর্লভ ছবি নিয়ে উপজেলা চত্বরে গ্যালারি স্থাপন করেন। দীর্ঘ একমাস এ গ্যালারি রূপগঞ্জের লোকজন প্রদর্শন করেছেন। মাদক থেকে দূরে রাখতে তরুণ ও যুব সমাজের জন্য ইউএনও গোল্ডকাপের আয়োজন করেন। প্রতিবন্ধী মেয়েদের জন্য নিজস্ব অর্থায়নে স্যানিটেশনের ব্যবস্থা করেন। গত এক বছরে প্রায় ২৫ টির মতো বাল্যবিয়ে বন্ধ করেছেন। তার মধ্যস্থায় ৩০ টির মতো সংসার বিচ্ছেদের হাত থেকে রক্ষা করেছেন।

রূপগঞ্জের মেধাবী শিক্ষার্থী তাসলিমাসহ বেশ কয়েকজনকে ঘর উপহার প্রদান করা হয়। হতদরিদ্র মানুষের মাঝে প্রধানমন্ত্রীর ঘর প্রদান করা। সূত্রে জানা গেছে, করোনাকালে সবচেয়ে বেশি ইতিহাস গড়েছেন উপজেলা নির্বাহী অফিসার মমতাজ বেগম। তিনি তার এক মাসের বেতন ও বোনাসের টাকা করোনা আক্রান্তদের জন্য তুলে দিয়েছেন নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসকের হাতে। এছাড়া করোনাকালে তিনি গোটা রূপগঞ্জ চষে বেড়িয়েছেন । কর্মহীন, হতদরিদ্র-অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন। উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে প্রায় ৮০ হাজার মানুষের মাঝে খাদ্যসামগ্রী তুলে দেওয়া হয়েছে। যা এখনো অব্যাহত। উপজেলার শিশু পরিবারের শিশুদের মাঝে ঈদ সামগ্রী বিতরণ করেছেন। এ শিশুদের সাথে ইফতার করেন।

জানা গেছে, ইতিবাচক কর্মকান্ডের পাশাপাশি তিনি অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিলেন। নানা রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে গাউসিয়া মার্কেটের ৩০ বছরের জঞ্জাল ফুটপাতের দোকানপাট উচ্ছেদ করেছেন। এখান থেকে মাসে কয়েক লাখ টাকা চাঁদা আদায় করা হতো। যেটা নিয়ে বিরাগভাজন হয়েছেন অনেকে। উচ্ছেদের জায়গা এখন ফুলের বাগানে সুসজ্জিত করা হয়েছে। রূপগঞ্জ ইউনিয়নে সরকারী জমিতে প্রভাবশালীর বহুতল ভবন গুড়িয়ে দিতেও কার্পণ্যতা করেননি তিনি। পূর্বাচল উপশহরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা স্টেডিয়ামের জায়গা দখল করে গড়ে তোলা নীলা মার্কেট উচ্ছেদ করা হয় তার নেতৃত্বে। যতোবার উচ্ছেদ করা হয়, ততোবারই দখল করে নীলা মার্কেট গড়ে তোলা হয়। অবশেষে কঠোর হুশিয়ারি জারি করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা স্টেডিয়ামের জায়গা উদ্ধার করা হয়। অবশেষে এখন স্টেডিয়ামের কাজ চলছে পুরোদমে।

রূপগঞ্জ উপজেলার ঢাকা-সিলেট মহাসড়কসহ বিভিন্ন সড়কে পরিবহন সেক্টরের চাঁদাবাজি বন্ধ করেছেন। করোনাকালে ব্যবসায়ীরা যেনো দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতি করতে না পারে সেই লক্ষ্যে উপজেলার বিভিন্ন বাজার ঘুরে মনিটরিং করেছেন। রূপগঞ্জ সদর ইউনিয়নের লকডাউন সফল করতে প্রতিদিন মাঠে থাকছেন। করোনাকালে লাশ দাফন, করোনা আক্রান্ত ব্যক্তিদের কোন সমস্যা না হওয়া থেকে শুরু করে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছেন। এসব কারণে তিনি অনেক প্রভাবশালীর বিরাগভাজনের শিকার হয়েছেন।

উপজেলা নির্বাহী অফিসার মমতাজ বেগম বলেন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার স্বপ্ন বাস্তবায়নে আমি মানুষের জন্য কাজ করে যাবো। প্রধানমন্ত্রীর সকল কর্মকান্ড সফল করতে বাস্তবায়নের চেষ্টা করবো। মানুষের জন্য কাজ করে যাবো। এতে যতো বাঁধা আসুকনা কেন। কোন অন্যায়-অবিচারের পক্ষে নই আমি। যতোদিন থাকবো ততোদিন রূপগঞ্জের মানুষের জন্য কাজ করবো।

শেয়ার করুন
  • 2.7K
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  





themesba-zoom1715152249
© Daily Jago কর্তৃক সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত।
Developed By: Nagorik IT