রবিবার, ১১ এপ্রিল ২০২১, ১২:২৮ অপরাহ্ন২৮শে চৈত্র, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

২৮শে শাবান, ১৪৪২ হিজরি

কদর বেড়েছে ফুলবাড়িয়ার ঐতিহ্যবাহি লাল চিনি

কদর বেড়েছে ফুলবাড়িয়ার ঐতিহ্যবাহি লাল চিনি

মোঃ হাবিব, ফুলবাড়িয়া (ময়মনসিংহ) থেকেঃ  কদর বেড়েছে ফুলবাড়িয়ার ঐতিহ্যবাহী ‘হাতে তৈরি লাল চিনি’র । আঁখ থেকে তৈরি করা  এ চিনি  খেতে যেমন সু-স্বাদু , তেমনি দামেও হাতের নাগালে । এক সময় উপজেলার প্রায় প্রতিটি গ্রামের আঁখের আবাদ হয়েছে। রাসায়নিক সার,কীটনাশকের দাম বৃদ্ধি, শ্রমিক সংকট,মুজরী বৃদ্ধি, উন্নত জাতের চারা না পাওয়ায় দিন দিন আঁখের চাষাবাদ কমে যাচ্ছে। ফলে ফুলবাড়িয়ার হাতে তৈরি ‘লাল চিনি’র বাজার ঠিক কতোদিন ধরে রাখতে পারবে তা-নিয়ে সন্দিহান স্থানীয়রা।

 

আঁখের আবাদঃ স্থানীয়রা আখ চাষীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, চৈত্র মাসের মাঝামাঝি থেকে বৈশাখ মাসের শেষ পর্যন্ত আখেরঁ চারা রোপন করা হয়। এরপর খড়কুটা দিয়ে ঢেকে দেয়া হয় চারা গুলো। চারা হতে অংকুর গজিয়ে আঁখ গাছে রূপ নেয়। এরপর থেকেই কৃষক শুরু করে আখের পরিচর্যা। অনেক কৃষক আবার জমি থেকে আঁখ গাছ কাটার পর গুড়ি থেকে যে অংকুর হয় সেখানেই প্রয়োজন মতো জৈব ও রাসায়নিক সার দিয়ে পুর্ণাঙ্গ আঁখে পরিণত করেন। পৌষ মাস থেকে শুরু করে একটানা ফাল্গুন মাস পর্যন্ত আঁখ মাড়াইয়ের কাজ চলে।

 

জ্বাল ঘর ও হাতে তৈরি লাল চিনিঃ  লাল চিনি তৈরির কারিগরদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, জ্বাল ঘরের ভিতরে এক সাথে ৯ থেকে ১১ টি চুল্লি করা হয়। জ্বাল ঘরের ১০ থেকে ১৫ হাত দূরে ১২ থেকে ১৫ শলা বিশিষ্ট লোহার চাপ যন্ত্রবসায়। চাপা যান্ত্রটি ইঞ্জিন চালিত মেশিনের সাহায্যে অথবা গরু-মহিষ দ্বারা ঘানি টেনে আঁখ মাড়াইয়ে মধ্যমে রস বের করে জ্বাল ঘরে থাকা বড় বড় ড্রামে রাখা হয়। প্রতি কাঠা ( সাড়ে ৬ শাতংশ) জমিতে ৫শ থেকে ৬শ কেজি আখের রস হয়। জ্বাল ঘরের চুল্লির উপর লোহাড় কড়াই পরিমান মতো ৫ থেকে ৭ কেজি কাঁচা রস দেয়া হয়। চুল্লির আগুনে ২০ থেকে ২৫ মিনিটে কাঁচা রস জ্বাল করার পর ঘন হয়ে আসলে চুল্লি থেকে লোহাড় কড়াই নামিয়ে লাল চিনি তৈরীর কারিগর কৃষাণ-কৃষাণী বা শ্রমিকদের সামনে দেয়। তারা কাঠের তৈরি ডাং (হাতল) দিয়ে গরম রসে দ্রুত ঘর্ষন শুরু করেন। আস্তে আস্তে ঠান্ডা হয়ে রস জমতে থাকে। দ্রুত ঘর্ষনের ফলে এক পর্যায়ে ধুলির মতো হয়ে লাল চিনি’তে রূপ নেয়। প্রতি কাঠায় চাষীরা ১৫০ থেকে ১৭০ কেজি লাল চিনি পেয়ে থাকেন। জ্বাল ঘরে চুল্লিতে কাঁচা রস জ্বাল দেয়া হয় আঁখের শুকনো পাতা ও ছুবলা দিয়েই। এতে বাড়তী কোন লাকড়ীর প্রয়োজন হয় না।

 

আখ চাষীরা যা বললেনঃ বাকতা ইউনিয়ন, কালদহ ইউনিয়ন, এনায়েতপুর ইউনিয়ন কুশমাইল ও রাধাকানাই ইউনিয়নসহ উপজেলায় এক সময় ব্যাপক আখের আবাদ হয়েছে। এখন প্রতি বছরই আখের চাষাবাদ কমে আসছে।  কৃষক আব্দুল হেকিম আড়াই থেকে তিন একর জমিতে আখের আবাদ করতেন, এ বছর তিনি আখ চাষ করেছেনে ৮ কাঠা জমিতে।
আখ চাষি সবেদ আলী, আব্দুল মজিদ ও আব্দুল হেকিম বলেন, আখ চাষে এখন তেমন লাভ হয় না, শ্রমিকের মুজুরি ও সার, কিটনাশকের মুল্য বৃদ্ধি, শ্রমিক সংকট, ও উন্নত মানের আখের চারা পাওয়া যায় না। যে কারনে দিন দিন আখ চাষে কৃষক আগ্রহ হারিয়ে ফেলছেন। প্রতি কাঠা আখ চাষে সবকিছু মিলিয়ে খরচ হয় প্রায় ৬ হাজার টাকা। কাঠা প্রতি সর্বোচ্চ সাড়ে তিন মণ চিনি হয়। প্রতিমণ চিনির বাজার মূল্য এখন ২৮শ থেকে ৩০০০ টাকা। আখ চাষীরা আখ সংরক্ষণ বা সরাসরি চিনিকলে বিক্রি করতে পারলে এ অঞ্চলে আখের সুদিন আবার ফিরে আসবে বলে কৃষকের ধারণা।

কৃষি অফিসের তথ্যঃ উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, ২০১৪ সালে আখের আবাদ হয়েছিল ১২৪০ হেক্টর জমিতে ও লাল চিনির উৎপাদন হয়েছিল ৬৬৯৬ মেট্রিক টণ। ২০১৫ সালে আখের আবাদ হয়েছিল ১২৫০ হেক্টর জমিতে ও লাল চিনির উৎপাদন হয়েছিল ৬৮১২মেট্রিক টণ। ২০১৬ সালে আখের আবাদ হয়েছিল ১২৫৫ হেক্টর জমিতে ও লাল চিনির উৎপাদন হয়েছিল ৬৮৩৯ মেট্রিক টণ। ২০১৭ সালে আখের আবাদ হয়েছিল ১২৬০ হেক্টর জমিতে ও লাল চিনির উৎপাদন হয়েছিল ৬৯৩০ মেট্রিক টণ। ২০১৮ সালে আখের আবাদ হয়েছিল ১২৮০ হেক্টর জমিতে ও লাল চিনির উৎপাদন হয়েছিল ৭০৮২ মেট্রিক টণ। ২০১৯ সালে আখের আবাদ হয়েছিল ১২৮০ হেক্টর জমিতে ও লাল চিনির উৎপাদন হয়েছিল ৭০২২ মেট্রিক টণ, ২০২০ সালে আখের আবাদ হয়েছিল ১২৮৫ হেক্টর জমিতে ও লাল চিনির উৎপাদন হয়েছিল ৬৭৪৬ মেট্রিক টণ লাল চিনি উৎপাদন হয়েছে।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা জেসমিন নাহার বলেন, আখের নতুন নতুন জাত হওয়ার কারনে অল্প জমিতে ফলন ভালো ও লাল চিনির উৎপাদন বাড়ছে।

 

শেয়ার করুন
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  





themesba-zoom1715152249
© Daily Jago কর্তৃক সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত।
Developed By: Nagorik IT